আসসালামু আলাইকুম। দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন আশার বার্তা নিয়ে সামনে আসছে নবম পে স্কেল।

অর্থমন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। বর্তমান দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং টানা মূল্যস্ফীতির চাপে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে বেতন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটি তাদের সুপারিশ অর্থমন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রস্তুতি চলছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নতুন পে স্কেলেও আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রেড সংখ্যা বাড়ানো বা কমানোর সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, গ্রেড কাঠামো পরিবর্তন করলে প্রশাসনিক জটিলতা অনেক বেড়ে যাবে। চাকরি বিধিমালা সংশোধন, পদ পুনর্বিন্যাস এবং আর্থিক হিসাবের কারণে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী হয়ে যেতে পারে। তাই বিদ্যমান গ্রেড কাঠামো বজায় রেখেই বেতন বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে করে দ্রুত বাস্তবায়নের পথও অনেকটা সহজ হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা দেখা যাচ্ছে।

জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও নতুন কোনো পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়নি। এর মধ্যে দেশের অর্থনীতি, বাজার পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পে কমিশন গঠন করে। সেই কমিশন বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে তাদের সুপারিশ জমা দেয়। পরে অর্থমন্ত্রণালয় এবং পুনর্গঠিত সচিব কমিটি সেই সুপারিশ নিয়ে কাজ শুরু করে। এখন পুরো বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

নতুন প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী প্রথম গ্রেডের বেতন ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। দ্বিতীয় গ্রেডে বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার মধ্যে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃতীয় গ্রেডে বেতন ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। চতুর্থ গ্রেডে সর্বোচ্চ বেতন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা। পঞ্চম গ্রেডে প্রস্তাবিত বেতন ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

এবার যদি আমরা মধ্যম স্তরের গ্রেডগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায় ষষ্ঠ গ্রেডে বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। সপ্তম গ্রেডে বেতন ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। অষ্টম গ্রেডে বেতন ৪৭ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। নবম গ্রেডে ৪৫ হাজার ১০০ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেতন নির্ধারণের আলোচনা চলছে। দশম গ্রেডে প্রস্তাবিত বেতন ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো মধ্যম স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্যও এবারের পে স্কেলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একাদশ গ্রেডে প্রস্তাবিত বেতন ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বাদশ গ্রেডে বেতন ২৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ত্রয়োদশ গ্রেডে বেতন ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চতুর্দশ গ্রেডে ২৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পঞ্চদশ গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০ থেকে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বেতন হতে পারে। এই ধাপের কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরেই বেতন বৈষম্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে নিচের দিকের গ্রেডগুলো। কারণ বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীরা। ষোড়শ গ্রেডে বেতন ২১ হাজার ৯০০ থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে। সপ্তদশ গ্রেডে ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত বেতন নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। অষ্টাদশ গ্রেডে প্রস্তাবিত বেতন ২১ হাজার থেকে ৫০ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। উনবিংশ গ্রেডে বেতন ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের আলোচনা রয়েছে। আর সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে বেতন ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি তৈরি হবে।

অর্থমন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানিয়েছে, একসাথে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়ন না করে কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কারণ এককালীন পুরো আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হতে পারে। তাই প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা সমন্বয় করার চিন্তা করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে অর্থনৈতিক চাপ কমবে এবং একই সঙ্গে কর্মচারীরাও ধীরে ধীরে সুবিধা পেতে শুরু করবেন।

সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা যায়, নবম পে স্কেল এখন আর শুধু আলোচনার বিষয় নয়, বরং বাস্তবায়নের দিকেই এগোচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে যে প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছেন, সেটি এবার বাস্তবে রূপ নিতে পারে। তবে চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সবকিছুই সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। তারপরও বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ, গ্রেড কাঠামো বহাল রাখা এবং নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া প্রকাশ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই ইতিবাচক। এখন দেখার বিষয়, সরকার কবে আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট প্রকাশ করে এবং কীভাবে ধাপে ধাপে এই পে স্কেল কার্যকর করে। নবম পে স্কেল নিয়ে আপনাদের মতামত কী? এই প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো কি বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন? অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন।

Post a Comment

0 Comments