আসসালামু আলাইকুম। সরকারি চাকরিজীবীদের বহু প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেল নিয়ে এখন চলছে ব্যাপক আলোচনা।

কে কত বেতন পাবে, কত শতাংশ বেসিক বাড়বে, এক ধাপে হবে নাকি দুই ধাপে বাস্তবায়ন হবে—এসব বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে অফিস আদালত পর্যন্ত এখন সরগরম। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে আগ্রহটা সবচেয়ে বেশি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এখনো সরকারিভাবে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ না হলেও বিভিন্ন সূত্র থেকে কিছু সম্ভাব্য হিসাব সামনে আসছে। আজকের আলোচনায় আমরা খুব সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করবো, যদি বেতন দ্বিগুণ হয় অথবা ৫০ শতাংশ করে ধাপে ধাপে বাড়ানো হয় তাহলে বাস্তবে একজন কর্মচারীর নতুন বেতন কত হতে পারে।

শুরুতেই একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিই, আমরা আজ যেসব হিসাব নিয়ে আলোচনা করবো সেগুলো সম্ভাব্য হিসাব। অর্থাৎ সরকারিভাবে এখনো কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। তবে বিভিন্ন কমিশন রিপোর্ট, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আলোচনা এবং যেসব তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে সেগুলোর ভিত্তিতেই আমরা একটা ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করছি। কারণ অনেকে শুধু শুনছেন “বেতন দ্বিগুণ হবে”, কিন্তু বাস্তবে সেটা কিভাবে হিসাব করা হয় সেটা বুঝতে পারছেন না। আবার কেউ ভাবছেন বর্তমান বেসিকের ওপর সরাসরি টাকা যোগ হবে। আসলে বাংলাদেশের পে ফিক্সেশনের একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সেই নিয়ম অনুযায়ী পুরনো ইনক্রিমেন্ট এবং নতুন স্কেলের পার্থক্য যোগ করে বেতন নির্ধারণ করা হয়। তাই পুরো হিসাবটা একটু বুঝে নেওয়া জরুরি।

চলুন তাহলে আমরা ২০তম গ্রেড দিয়ে উদাহরণ শুরু করি। বর্তমানে ২০তম গ্রেডে একজন কর্মচারীর মূল বেসিক ধরা যাক ৮ হাজার ২৫০ টাকা। এখন তিনি যদি কয়েক বছর চাকরি করেন এবং নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট পান, তাহলে তার বেসিক গিয়ে দাঁড়াতে পারে ১০ হাজার ৫৬০ টাকায়। অর্থাৎ শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত তার বেতনে প্রায় ২ হাজার ৩১০ টাকার পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এখন যদি নতুন পে স্কেলে সরকার এই ৮২৫০ টাকার ধাপটিকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে, তাহলে পুরনো ইনক্রিমেন্টের এই পার্থক্যটাও যোগ হবে। অর্থাৎ ২০ হাজার টাকার সঙ্গে ২ হাজার ৩১০ টাকা যোগ করলে নতুন বেসিক দাঁড়াবে ২২ হাজার ৩১০ টাকা। এভাবেই সাধারণত পে ফিক্সেশন করা হয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সরকার পুরো বেতন একসঙ্গে কার্যকর না করে প্রথম বছরে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি দেয় তাহলে কি হবে? এখানেই অনেকেই একটু কনফিউজ হয়ে যান। ধরুন আপনার বর্তমান বেসিক ১০ হাজার ৫৬০ টাকা। আর নতুন স্কেলে সেটা হওয়ার কথা ২২ হাজার ৩১০ টাকা। তাহলে দুইটার মধ্যে পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ১১ হাজার ৭৫০ টাকা। এখন যদি সরকার এই ব্যবধানের অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ দেয়, তাহলে আপনি পাবেন প্রায় ৫ হাজার ৮৭৫ টাকা অতিরিক্ত। সেটাকে আপনার বর্তমান বেসিকের সঙ্গে যোগ করলে নতুন বেতন দাঁড়াবে প্রায় ১৬ হাজার ৪৩৫ টাকা। অর্থাৎ পুরো সুবিধা না পেলেও প্রথম ধাপেই একজন কর্মচারীর বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

এখন আবার অনেকে বলছেন, ২০ হাজার টাকা না হয়ে যদি সরকার শুধু ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি দেয় অর্থাৎ বর্তমান স্কেল দ্বিগুণ করে তাহলে কী হবে? সেক্ষেত্রেও হিসাবটা একটু আলাদা। ধরুন ৮ হাজার ২৫০ টাকার বেসিক সরাসরি দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ালো ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। এখন আগের মতোই ইনক্রিমেন্টের পার্থক্য অর্থাৎ ২ হাজার ৩১০ টাকা এর সঙ্গে যোগ হবে। তাহলে নতুন বেসিক দাঁড়াবে ১৮ হাজার ৮১০ টাকা। এখন যদি এই ১৮ হাজার ৮১০ টাকাও সরকার পুরোপুরি একসঙ্গে কার্যকর না করে এবং ৫০ শতাংশ হারে দেয়, তাহলে বর্তমান বেতন আর নতুন বেতনের পার্থক্যের অর্ধেক যোগ হবে। ফলে বাস্তবে একজন কর্মচারীর হাতে আসা বেতন কিছুটা কম হলেও আগের তুলনায় অনেকটাই বাড়বে।

এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং পেনশন হিসাব। কারণ শুধু মূল বেতন বাড়লেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। সরকারি চাকরিজীবীদের মোট আয়ের বড় একটা অংশ আসে বিভিন্ন ভাতা থেকে। এখন যদি বেসিক দুই ধাপে বাড়ানো হয়, তাহলে বাড়িভাড়া কীভাবে হিসাব হবে, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন কিভাবে সমন্বয় করা হবে, সেই প্রশ্নও উঠছে। কারণ বাংলাদেশের পে স্কেল শুধু একটি সংখ্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িত থাকে হাজারো প্রশাসনিক এবং আর্থিক হিসাব। তাই সরকার যদি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেই অনুযায়ী আলাদা সারণী তৈরি করতে হবে। আর এ কারণেই পুরো প্রক্রিয়াটা কিছুটা সময়সাপেক্ষ হয়ে যাচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিছু সূত্র বলছে, নতুন অর্থবছরে আংশিক বাস্তবায়নের সম্ভাবনাই বেশি। কারণ একসঙ্গে পুরো স্কেল কার্যকর করলে সরকারের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হবে। বর্তমানে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই চলে যায় বেতন-ভাতা খাতে। নতুন স্কেল পুরোপুরি কার্যকর হলে সেই ব্যয় আরও অনেক বেড়ে যাবে। তাই প্রথম ধাপে শুধু মূল বেতন বাড়িয়ে পরে ধীরে ধীরে অন্যান্য সুবিধা যোগ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও চাকরিজীবীদের অনেকেই চাইছেন একসঙ্গে পুরো বাস্তবায়ন। কারণ বাজার পরিস্থিতিতে সীমিত বেতন বৃদ্ধি দিয়ে জীবনযাত্রার খরচ সামাল দেওয়া এখনও কঠিন। তবুও সরকার বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই এগোতে চায়।

অনেকে আবার প্রশ্ন করছেন, আসলেই কি ১ জুলাই থেকে এই পে স্কেল কার্যকর হবে? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনো কেউ নিশ্চিতভাবে দিতে পারছে না। তবে বিভিন্ন আলোচনা থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, জুলাই অথবা আগস্টের মধ্যেই নতুন স্কেল কার্যকরের ঘোষণা আসতে পারে। যদিও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, গেজেট প্রকাশ এবং অর্থ বিভাগের অনুমোদনের কারণে কিছুটা দেরি হতে পারে। তবে যদি দেরিও হয়, সেক্ষেত্রে চাকরিজীবীরা এরিয়ার হিসেবে ১ জুলাই থেকেই সুবিধা পেতে পারেন। অতীতেও এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে পরে গেজেট হলেও আগের তারিখ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তাই এখন সবাই অপেক্ষা করছে সরকারের চূড়ান্ত ঘোষণার জন্য।

নবম পে স্কেল শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নয়, পুরো দেশের অর্থনীতির জন্যই বড় একটি বিষয়। কারণ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত রয়েছে লাখ লাখ পরিবার। একইসঙ্গে সরকারের বাজেট, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও এর প্রভাব পড়বে। তাই সরকারকে যেমন চাকরিজীবীদের স্বার্থ দেখতে হবে, তেমনি অর্থনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত সরকার কী ধরনের কাঠামো ঘোষণা করে এবং বাস্তবে কর্মচারীরা কতটুকু সুবিধা পান। তবে এটা নিশ্চিত, বহু প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেল নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখন তুঙ্গে এবং সবাই তাকিয়ে আছে আসন্ন বাজেট ও সরকারি ঘোষণার দিকে।

Post a Comment

0 Comments