নতুন অর্থবছরকে সামনে রেখে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে সরকারি চাকরিজীবীদের নবম পে স্কেল।

দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, নানা জল্পনা আর অসংখ্য বৈঠকের পর অবশেষে আংশিক বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে সরকার। তবে পুরো সুবিধা একসঙ্গে নয়, ধাপে ধাপে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক চাপের মধ্যেও সরকার বেতন কাঠামো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে যেমন স্বস্তি তৈরি হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। কারণ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের ব্যয়ও বাড়ছে কয়েকগুণ। নতুন অর্থবছর থেকেই শুরু হচ্ছে প্রথম ধাপের বাস্তবায়ন।

সরকারি সূত্র বলছে, প্রথম ধাপে শুধু মূল বেতন বাড়ানো হবে প্রস্তাবিত সুপারিশের ৫০ শতাংশ হারে। অর্থাৎ কমিশন যে পরিমাণ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে তার অর্ধেক এখন কার্যকর হবে। এর ফলে নিম্ন গ্রেড থেকে শুরু করে উচ্চ গ্রেড পর্যন্ত সবাই কোনো না কোনোভাবে বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবে। যদিও ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা এখনই যোগ হচ্ছে না। সরকার বলছে, হঠাৎ পুরো বাস্তবায়ন করলে বাজেটের উপর বিশাল চাপ তৈরি হবে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা চলছে। তবে এতে অসন্তুষ্ট অনেক কর্মচারীও।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠন করা হয় নবম পে কমিশন। দীর্ঘ গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে কমিশন তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেয়। সেখানে বলা হয়েছিল সরকারি চাকরিজীবীদের বর্তমান বেতন কাঠামো সময়োপযোগী নয়। বাজারদর বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে হলে নতুন কাঠামো জরুরি। কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। একইসঙ্গে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতনও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। যা বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।

কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ গ্রেডেও বড় ধরনের বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। এই সুপারিশ প্রকাশের পর থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ ২০১৫ সালের পর এটিই সবচেয়ে বড় বেতন কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই বৃদ্ধি প্রয়োজন ছিল। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, শুধুমাত্র বেতন বাড়ালেই হবে না, সেইসাথে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। না হলে শুধু ব্যয় বাড়বে, কিন্তু সেবার মান বাড়বে না।

এদিকে সরকারের ভেতরেও এই পে স্কেল নিয়ে চলছে নানা ধরনের হিসাব-নিকাশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর একসঙ্গে বিশাল আর্থিক চাপ পড়বে। তাই প্রথম বছর শুধু মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর করা হচ্ছে। পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অংশ যুক্ত হবে। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে যোগ করা হতে পারে বিভিন্ন ভাতা ও অতিরিক্ত সুবিধা। অর্থাৎ পুরো সুবিধা পেতে সরকারি চাকরিজীবীদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক বছর। এতে অনেকে হতাশ হলেও সরকার বলছে, বর্তমান বাস্তবতায় এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেতন বাড়ানোই সমস্যার সমাধান নয়। কারণ দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এখনও দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তাই ইতিবাচক প্রণোদনার পাশাপাশি কঠোর জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। অনেকেই বলছেন, অতীতে বারবার দেখা গেছে বেতন বাড়লেও সেবার মানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই জনগণের ভোগান্তি আগের মতোই থেকে গেছে। তাই এবার বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিও জোরালো হয়েছে। জনগণ এখন শুধু বেতন বাড়ানোর খবর নয়, সেবার মান উন্নয়নও দেখতে চায়।

অন্যদিকে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের একটি অংশ এই সুপারিশকে বৈষম্যমূলক বলেও অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের তুলনায় নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীরা বাস্তব সুবিধা কম পাচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য আরও বেশি সহায়তা দরকার ছিল। তারা বলছেন, শুধু শতাংশের হিসাবে বৃদ্ধি দেখালে হবে না, বাস্তব জীবনে সেই টাকা কতটা কাজে লাগছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দ্রব্যমূল্যের বাজারে সীমিত বেতন বৃদ্ধি অনেক সময় বড় স্বস্তি দিতে পারে না। ফলে এই পে স্কেল নিয়েও মাঠপর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের কারণে সরকারের পরিচালন ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকা। নতুন কাঠামো চালু হলে সেই ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রথম ধাপ বাস্তবায়নেই অতিরিক্ত কয়েকশ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। আর পুরো সুপারিশ কার্যকর হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে লাখ কোটি টাকারও বেশি। ফলে উন্নয়ন বাজেট, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য খাতেও চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা তাই ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

রাজনৈতিকভাবেও বিষয়টি এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সরকারি চাকরিজীবীরা দেশের একটি বড় ও প্রভাবশালী অংশ। তাদের সন্তুষ্ট রাখা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে সাধারণ জনগণও নজর রাখছে, এই বেতন বৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে কীভাবে পড়ে। কারণ সরকারের ব্যয় বাড়লে অনেক সময় করের চাপ কিংবা মূল্যস্ফীতির প্রভাবও বেড়ে যেতে পারে। তাই নবম পে স্কেল শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি এখন অর্থনীতি ও রাজনীতিরও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী কয়েক বছরে এর বাস্তব প্রভাবই ঠিক করে দেবে এই সিদ্ধান্ত কতটা সফল হয়েছে।

Post a Comment

0 Comments