আসসালামু আলাইকুম। সরকারি চাকরিজীবীদের বহু প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেল নিয়ে আবারও সামনে এসেছে বড় কিছু আপডেট।

বিশেষ করে যারা প্রতিদিন অপেক্ষা করছেন কবে গেজেট হবে, কবে নতুন বেতন কার্যকর হবে, তারা আজকের আলোচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারবেন। কারণ এখন যে চারটি প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি ঘুরে বেড়াচ্ছে চাকরিজীবীদের মনে, আজ আমরা সেই প্রশ্নগুলোর সম্ভাব্য এবং বাস্তবসম্মত উত্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য পাচ্ছেন, কেউ বলছেন জুলাই, কেউ বলছেন সেপ্টেম্বর, আবার কেউ বলছেন পুরো বিষয়টাই এখনো অনিশ্চিত। তাই আজকের আলোচনায় চেষ্টা করবো সহজ ভাষায় পুরো বিষয়টা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে।

প্রথম যে প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বেশি করা হচ্ছে সেটি হলো, নবম পে স্কেলের পূর্ণাঙ্গ সরকারি গেজেট কবে প্রকাশ হতে পারে? বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী এখনো কিছু প্রশাসনিক এবং আইনি প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। কারণ শুধু একটি কমিশনের সুপারিশ দিলেই পে স্কেল কার্যকর হয় না। এর সঙ্গে জড়িত থাকে অর্থ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন অনুমোদন। প্রতিটি ধাপ শেষ করে তারপরই গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে আবার ঈদের ছুটি, বাজেট অধিবেশন এবং প্রশাসনিক ব্যস্ততাও রয়েছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে আগস্ট অথবা সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ সরকারি গেজেট প্রকাশ হতে পারে। তবে ইতিবাচক দিক হচ্ছে সরকার এখন আর পে স্কেল বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে আসছে না।

এখন অনেকে ভাবছেন, যদি আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে গেজেট প্রকাশ হয় তাহলে জুলাই মাস থেকে যে নতুন বেতন কার্যকর হওয়ার কথা ছিল সেই টাকা কি হারিয়ে যাবে? এর উত্তর হচ্ছে না। কারণ সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পে স্কেল কার্যকর ধরা হবে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে। অর্থাৎ গেজেট দেরিতে প্রকাশ হলেও চাকরিজীবীরা বকেয়া হিসেবে বাড়তি বেতন পাবেন। ধরুন সেপ্টেম্বর মাসে গেজেট প্রকাশ হলো, তাহলে জুলাই ও আগস্ট মাসের অতিরিক্ত টাকা একসঙ্গে এরিয়ার হিসেবে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যোগ হবে। অতীতেও এমন উদাহরণ রয়েছে। অষ্টম পে স্কেল বাস্তবায়নের সময়ও গেজেট পরে হলেও আগের মাসের টাকা বকেয়া হিসেবে দেয়া হয়েছিল। তাই এ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিশেষ প্রণোদনা বা মহার্ঘ ভাতা। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ হারে যে বিশেষ সুবিধা চালু রয়েছে, সেটি নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে থাকবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী সরকার নতুন বেতন কাঠামোর মধ্যেই এই ভাতাগুলো সমন্বয় করার পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ আলাদা করে প্রণোদনা দেয়ার পরিবর্তে মূল বেতনের মধ্যেই সেই সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এর ফলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় অনেকটা কমে আসবে। কারণ শুধু এই বিশেষ প্রণোদনা বন্ধ করেই কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ।

তবে এখানেই আরেকটা জটিল প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদি সেপ্টেম্বর মাসে গেজেট প্রকাশ হয়, তাহলে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে সময় চাকরিজীবীরা পুরনো বেতন পাবেন, সেই সময়ের বিশেষ প্রণোদনা কি থাকবে? সম্ভাবনা হচ্ছে, গেজেট প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত বিশেষ প্রণোদনা চালু থাকবে। অর্থাৎ ওই কয়েক মাসের বেতনের সঙ্গে আপনারা আগের মতোই ১০ বা ১৫ শতাংশ অতিরিক্ত সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু পরে যখন এরিয়ার হিসাব করে নতুন পে স্কেল কার্যকর করা হবে, তখন সেই বিশেষ প্রণোদনার কিছু অংশ সমন্বয় করা হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সরকারি নির্দেশনা আসেনি। তাই বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

এবার আসি এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং কর্মচারীদের প্রসঙ্গে। কারণ সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি তারাও দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে স্কেলের অপেক্ষায় রয়েছেন। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতন পেলেও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় এখনও অনেক পিছিয়ে আছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে বড় বৈষম্য রয়েছে। তবে নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন হলে তারাও নতুন কাঠামোর সুবিধা পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু তারা সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন, তাই নতুন স্কেলের সুবিধা থেকে তাদের বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। ফলে শিক্ষক সমাজের মধ্যেও এখন নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির আলোচনা চলছে। অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান বেতন প্রায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। একইসঙ্গে বাড়িভাড়া, টিফিন ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও নতুনভাবে সমন্বয় করা হতে পারে। তবে চিকিৎসা ভাতা এখনো খুবই কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে যেখানে অনেক সরকারি কর্মকর্তা কয়েক হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পান, সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মাত্র ৫০০ টাকার মতো সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাই শিক্ষক সমাজ এখন আশা করছে, নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে অন্তত এই বৈষম্য কিছুটা হলেও কমবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন। কারণ সরকার যদি একসঙ্গে পুরো পে স্কেল কার্যকর করে, তাহলে বাজেটের ওপর বিশাল চাপ পড়বে। তাই প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ এবং পরে বাকি অংশ বাস্তবায়নের আলোচনা চলছে। এতে করে সরকারি চাকরিজীবীরা কিছুটা দেরিতে হলেও ধীরে ধীরে পূর্ণ সুবিধা পাবেন। তবে অনেকেই বলছেন, যতদিন পুরো পে স্কেল কার্যকর না হবে ততদিন বিশেষ প্রণোদনা চালু রাখা উচিত। কারণ বাজার পরিস্থিতি এবং দ্রব্যমূল্যের চাপে শুধু আংশিক বেতন বৃদ্ধি দিয়ে বাস্তব জীবন চালানো এখনও কঠিন। তাই এই বিষয়টি নিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

নবম পে স্কেল এখন আর শুধুই গুজব বা আলোচনা নয়, বরং বাস্তবায়নের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলেই গেজেট প্রকাশের পথ পরিষ্কার হবে। সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক, কর্মচারী—সবাই এখন তাকিয়ে আছেন আসন্ন সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ এই পে স্কেল শুধু বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়, এটি লাখ লাখ পরিবারের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত। তাই সরকারকেও এখন অত্যন্ত সতর্কভাবে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করতে হচ্ছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে এটা বলা যায়, অপেক্ষা হয়তো আর খুব বেশি দীর্ঘ হবে না।

Post a Comment

0 Comments