নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে কিভাবে নতুন বেতন হিসাব করা হবে।
কারণ এবার যে তথ্যগুলো সামনে আসছে সেখানে বলা হচ্ছে পুরো পে স্কেল একসাথে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হতে পারে। অর্থাৎ প্রথম বছর বেসিকের একটি অংশ, পরের বছর বাকি অংশ এবং পরবর্তীতে অন্যান্য ভাতাগুলো যুক্ত করা হবে। অনেকেই বুঝতে পারছেন না আসলে ৫০ শতাংশ বেসিক বৃদ্ধি মানে কী, কিভাবে নিজের বেতন হিসাব করতে হবে এবং ইনক্রিমেন্ট থাকলে সেটি কিভাবে যোগ হবে। আজকের এই ভিডিওতে আমি খুব সহজভাবে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে দেব যাতে আপনারা নিজ নিজ গ্রেড অনুযায়ী খুব সহজেই নিজের নতুন বেতন বের করতে পারেন।
প্রথমেই আপনাদের বুঝতে হবে, নতুন পে স্কেল যদি তিন ধাপে কার্যকর করা হয় তাহলে প্রথম ধাপে শুধুমাত্র বেসিকের একটি অংশ যুক্ত হবে। আলোচনা অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন স্কেলের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হতে পারে। এরপর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ যোগ হবে। আর বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধাগুলো ধাপে ধাপে পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। এর মানে হলো শুরুতেই পুরো বেতন বৃদ্ধি হাতে আসবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে পুরো স্কেল কার্যকর হলে একজন কর্মচারীর মোট আয় অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ৫০ শতাংশ কিভাবে হিসাব করবেন। কারণ বাংলাদেশে আগে কখনো এভাবে আংশিক পে স্কেল কার্যকর করা হয়নি। তাই অনেকেই কনফিউজ হয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টা আসলে খুব সহজ। ধরুন একজন ১৪তম গ্রেডের কর্মচারীর ২০১৫ সালের বেসিক ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। নতুন পে স্কেলে সেই বেসিক ধরা হয়েছে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা। তাহলে দুইটার পার্থক্য দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৩০০ টাকা। এখন যেহেতু পুরোটা একসাথে দেওয়া হবে না, তাই এই বাড়তি অংশকে দুই ভাগ করা হবে। অর্থাৎ প্রথম ধাপে ওই কর্মচারী পাবেন ৬ হাজার ৬৫০ টাকা বৃদ্ধি।
এখন এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। অনেক কর্মচারী চাকরিতে যোগদানের পর একাধিক ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। অর্থাৎ কারো বর্তমান বেসিক আর আগের মতো ১০ হাজার ২০০ টাকা নেই। ধরুন একজন কর্মচারীর বর্তমান বেসিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪০০ টাকা। তাহলে বুঝতে হবে তিনি আগের বেসিকের চেয়ে অতিরিক্ত ২ হাজার ২০০ টাকা ইতোমধ্যেই ইনক্রিমেন্ট হিসেবে পাচ্ছেন। নতুন স্কেল হিসাব করার সময় এই ইনক্রিমেন্ট বাদ যাবে না। বরং সেটি নতুন হিসাবের সাথেই যুক্ত হবে। ফলে ৬ হাজার ৬৫০ টাকার সাথে ওই ২ হাজার ২০০ টাকা যোগ হয়ে নতুন বেসিক আরও বাড়বে।
এই হিসাব অনুযায়ী ওই কর্মচারীর বর্তমান বেসিক দাঁড়াবে ১৯ হাজার ৫০ টাকা। অর্থাৎ আগের বেসিকের সাথে ৫০ শতাংশ নতুন স্কেল এবং পুরনো ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়ে এই নতুন বেতন তৈরি হবে। এখান থেকেই মূলত নতুন পে স্কেলের প্রথম ধাপ শুরু হবে। তবে অনেকেই ভাবছেন বাড়িভাড়া বা অন্যান্য ভাতা কি সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে কিনা। বাস্তবতা হলো এই বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে সরকারের প্রজ্ঞাপনের উপর। কারণ এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়নি। তাই সরকার যদি আলাদা করে ঘোষণা দেয়, তখনই বোঝা যাবে কোন ভাতা কখন কার্যকর হবে।
বাড়িভাড়ার বিষয়টি নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। কারণ সব এলাকায় বাড়িভাড়ার হার এক নয়। কেউ ইউনিয়ন পর্যায়ে চাকরি করেন, কেউ পৌরসভায়, আবার কেউ শহর বা মেট্রোপলিটন এলাকায় কর্মরত আছেন। সাধারণত অনেক ক্ষেত্রে বেসিকের ৪৫ শতাংশ বা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে নতুন স্কেলের সঙ্গে সঙ্গে কি এই বাড়িভাড়াও বাড়বে, নাকি আগের হিসাবেই চলবে। যেহেতু আলোচনা হচ্ছে ভাতাগুলো তৃতীয় ধাপে কার্যকর হবে, তাই শুরুতেই বাড়িভাড়ায় বড় পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তবে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কার্যকর হলে সেটির প্রভাব কিছুটা পড়তে পারে।
এখন আসি চিকিৎসা ভাতার কথায়। বর্তমানে প্রথম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত অধিকাংশ সরকারি কর্মচারী নির্দিষ্ট পরিমাণ চিকিৎসা ভাতা পান। আলোচনা অনুযায়ী আপাতত এই ভাতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ নতুন পে স্কেলের প্রথম ধাপে মূলত বেসিক বৃদ্ধির দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই আপনার নতুন বেসিকের সাথে চিকিৎসা ভাতা আগের মতোই যোগ হবে। এছাড়া যদি কেউ শিক্ষা ভাতা পান, সেটিও আগের হারে যোগ হতে পারে। ভবিষ্যতে সরকার নতুন প্রজ্ঞাপনে শিক্ষা ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা বাড়ালে তখন সেটি কার্যকর হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিশেষ প্রণোদনা ভাতা। অনেক সরকারি কর্মচারী বর্তমানে বেসিকের উপর নির্দিষ্ট হারে বিশেষ প্রণোদনা পাচ্ছেন। এখন নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে এই বিশেষ প্রণোদনা চালু থাকবে কিনা সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিভিন্ন আলোচনা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, নতুন স্কেলের ৫০ শতাংশ কার্যকর হওয়ার পর আগের বিশেষ প্রণোদনা হয়তো বাতিল হয়ে যেতে পারে। কারণ সরকার মনে করতে পারে যে নতুন বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমেই সেই সুবিধা সমন্বয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাস্তবে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি দেখালেও, বিশেষ প্রণোদনা বাদ গেলে কার্যকর বৃদ্ধি কিছুটা কমে যেতে পারে।

0 Comments