আসসালামু আলাইকুম। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, আলোচনা আর জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে নবম পে স্কেল নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে শুরু করেছে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এবার বাড়তি সুবিধা রাখার পরিকল্পনা করছে সরকার। কারণ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ এখন এই শ্রেণির কর্মচারীদের ওপরই পড়ছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সামলাতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন। তাই সরকার এবার নতুন বেতন কাঠামোতে নিচের দিকের গ্রেডগুলোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বেতন বৃদ্ধির হারও তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা জুলাই থেকেই নতুন কাঠামোর প্রথম ধাপ কার্যকর করার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে পুরো সুবিধা একসঙ্গে দেয়া হবে না। প্রথম ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের বর্তমান মূল বেতনের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ সমন্বিত বেতন পাবেন। অর্থাৎ যারা এখন যে মূল বেতন পাচ্ছেন, তার সঙ্গে বাড়তি অর্ধেক পরিমাণ সমন্বয় যোগ হবে। এর ফলে প্রথম বছরেই বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। যদিও এটি পূর্ণ বাস্তবায়ন নয়, তবে চাকরিজীবীদের জন্য এটি একটি বড় স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন পর সরকারি বেতন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, দ্বিতীয় ধাপে আবারও একই হারে সমন্বয় যোগ করা হবে। অর্থাৎ পরবর্তী অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ সমন্বয় যুক্ত হয়ে মূল বেতনের পূর্ণ সমন্বয় সম্পন্ন হবে। এভাবে দুই বছরের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, একসঙ্গে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়ন করলে বাজেটের ওপর বিশাল চাপ পড়বে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা চলছে। যদিও অনেক চাকরিজীবী চাইছেন একসঙ্গে পুরো সুবিধা কার্যকর হোক। তবে বাস্তবতার কথা বিবেচনা করেই সরকার আপাতত এই পদ্ধতিতে এগোতে চাইছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিভিন্ন ভাতা ও অতিরিক্ত সুবিধা। কারণ শুধু মূল বেতন বাড়লেই মোট আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি বাড়ে না। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, ঝুঁকি ভাতা, বিশেষ প্রণোদনা এবং অন্যান্য সুবিধাগুলোও সরকারি চাকরিজীবীদের আয়ের বড় অংশ। কিন্তু সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব সুবিধা প্রথম দুই বছরে পুরোপুরি কার্যকর করা হচ্ছে না। অর্থাৎ প্রথম ধাপে শুধুমাত্র মূল বেতনের সমন্বয় হবে। আর তৃতীয় বছর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এসব ভাতা ও আর্থিক সুবিধা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা হতে পারে। তবে এর মধ্যে বর্তমানে যে ভাতাগুলো চালু রয়েছে সেগুলো বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, একসঙ্গে সব সুবিধা কার্যকর করলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে। বর্তমানে রাজস্ব আয়ের অবস্থা, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বাজেট ঘাটতির বিষয়গুলো মাথায় রেখেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকার চাইছে একদিকে চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করতে, অন্যদিকে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপও এড়িয়ে চলতে। তাই পুরো বিষয়টি এখন খুব হিসাব করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং একই সঙ্গে চাকরিজীবীরাও ধীরে ধীরে সুবিধা পাবেন।

নতুন পে স্কেলের আওতায় শুধু প্রশাসন ক্যাডার নয়, আরও অনেক শ্রেণির সরকারি কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এর মধ্যে শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসন, বিচার বিভাগীয় কর্মচারীসহ প্রায় সব সরকারি চাকরিজীবীই থাকছেন। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত এবং আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও বিশেষ সমন্বয় আনার আলোচনা চলছে। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় থাকা কাউকেই নতুন সুবিধা থেকে বাদ দেওয়ার চিন্তা নেই। ফলে দেশের লাখ লাখ সরকারি কর্মচারী এখন এই নতুন কাঠামোর দিকে তাকিয়ে আছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বৈষম্য কমানোর চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তারা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পান, অথচ নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। তাই এবার নিচের দিকের গ্রেডগুলোর জন্য তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কারণ এ শ্রেণির কর্মচারীরাই মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করেন এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাবও তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়ে। ফলে নতুন পে স্কেলে এই বৈষম্য কিছুটা হলেও কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। 

এদিকে পেনশনভোগীদের জন্যও সুখবর আসছে। সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশন পেনশনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী যাদের মাসিক পেনশন ২০ হাজার টাকার কম, তাদের পেনশন প্রায় শতভাগ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। অর্থাৎ কেউ যদি বর্তমানে ১৫ হাজার টাকা পেনশন পান, তাহলে নতুন কাঠামোতে সেটা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে যাদের পেনশন ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে, তাদের জন্য প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। আর ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বৃদ্ধি রাখার আলোচনা চলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেনশনভোগীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ অবসরের পর অনেকেই সীমিত আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খান। চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধের খরচ এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পেনশনের বর্তমান কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। তাই নতুন পে স্কেলের সঙ্গে পেনশন বৃদ্ধির বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে অর্থ বিভাগের অনুমোদন এবং বাজেট সক্ষমতার বিষয়গুলোও দেখা হবে। তারপরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসবে বলে জানা গেছে।

নবম পে স্কেল এখন দেশের লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীর জন্য আশার বড় একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। যদিও এখনো অনেক বিষয় চূড়ান্ত হয়নি, তবে যেসব তথ্য সামনে আসছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সরকার এবার ধাপে ধাপে হলেও বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের দিকে বাড়তি গুরুত্ব দেয়া, পেনশন বৃদ্ধির পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতে ভাতা সমন্বয়ের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এটি হতে পারে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক সংস্কারের একটি। এখন সবার চোখ চূড়ান্ত গেজেট এবং সরকারি ঘোষণার দিকে।

Post a Comment

0 Comments