আসসালামু আলাইকুম। দেশের লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর জন্য আজ আবারও বড় এক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে নবম পে স্কেল।
বিশেষ করে 11 থেকে 20 তম গ্রেডের কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য নিয়ে যে অসন্তোষ ছিল সেটি নিরসনের পথে যাচ্ছে বলে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। অর্থমন্ত্রণালয়ের নতুন প্রস্তাবিত কাঠামো ঘিরে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এখন ব্যাপক আলোচনা চলছে। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা মনে করছেন এবার হয়তো তাদের বহু বছরের কষ্ট ও আর্থিক সংকটের কিছুটা সমাধান আসতে পারে। কারণ নতুন কাঠামোয় শুধু বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়, বরং বৈষম্য কমানোর দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের অন্যতম বড় অভিযোগ ছিল নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাজারে দ্রব্যমূল্য যেভাবে বেড়েছে তাতে অনেক কর্মচারীর জন্য মাসের শেষ পর্যন্ত সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে 16 থেকে 20 তম গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে ছিলেন। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা, যাতায়াত সব মিলিয়ে মাসের অর্ধেক যেতে না যেতেই বেতন শেষ হয়ে যেত। ফলে অনেকেই ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছিলেন। এই বাস্তবতা থেকেই সরকার নতুন বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনার দিকে এগিয়েছে।
অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত নতুন তালিকায় দেখা যাচ্ছে 11 থেকে 20 তম গ্রেড পর্যন্ত বেতন কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগে যেখানে গ্রেডগুলোর মধ্যে ব্যবধান অনেক বেশি ছিল এখন সেটিকে ধাপে ধাপে ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ নিচের গ্রেডগুলোতে তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি রেখে আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন 20 হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ বেতন ধরা হয়েছে 1 লাখ 60 হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ আগের তুলনায় নিচের গ্রেডে দ্বিগুণেরও বেশি বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে 20 তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এটি বড় ধরনের পরিবর্তন হতে পারে। কারণ বর্তমানে যে বেতন কাঠামো রয়েছে তা দিয়ে শহরাঞ্চলে জীবনযাপন করাই অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। নতুন স্কেল কার্যকর হলে অন্তত ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত হতে পারে।
প্রস্তাবিত তালিকায় 11 তম গ্রেডের মূল বেতন 36 হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের আলোচনা রয়েছে। এরপর 12 তম গ্রেডে 34 হাজার, 13 তম গ্রেডে 32 হাজার এবং 14 তম গ্রেডে 30 হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। 15 তম গ্রেডে 28 হাজার, 16 তম গ্রেডে 26 হাজার এবং 17 তম গ্রেডে 24 হাজার টাকা ধরা হয়েছে। এছাড়া 18 তম গ্রেডে 22 হাজার, 19 তম গ্রেডে 21 হাজার এবং 20 তম গ্রেডে সর্বনিম্ন 20 হাজার টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে ধাপে ধাপে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
শুধু মূল বেতন নয়, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন যে চিকিৎসা ভাতা এবং বাড়িভাড়া বাস্তব খরচের তুলনায় অত্যন্ত কম। নতুন কাঠামোয় সেই বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য বাড়িভাড়া ভাতা বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে। পাশাপাশি চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি পেলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতে পারে।
সরকারি সূত্র বলছে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে এগোনোর সম্ভাবনাই বেশি। কারণ একসাথে পুরো কাঠামো কার্যকর করলে সরকারের উপর বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হবে। তাই প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী ধাপে ভাতা সমন্বয়ের পরিকল্পনা থাকতে পারে। এ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নিয়ে একটি চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করছে। খুব দ্রুতই সেই সুপারিশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জমা পড়তে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীরাও নতুন স্কেল নিয়ে আশাবাদী। কারণ মূল বেতন বৃদ্ধি পেলে তার সরাসরি প্রভাব পেনশনেও পড়বে। অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী বর্তমানে সীমিত পেনশন নিয়ে কঠিন সময় পার করছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের আর্থিক চাপ অনেক বেড়েছে। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে পেনশনভোগীরাও বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে অবসরপ্রাপ্তদের জীবনযাত্রায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যেও নতুন পে স্কেল নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অতীতের মতো এবারও জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে তাদের সুবিধা সমন্বয় করা হতে পারে। যদিও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগতে পারে, তবুও শিক্ষক সমাজ নতুন স্কেল নিয়ে আশাবাদী। কারণ দীর্ঘদিন ধরে তারাও বেতন বৈষম্য এবং সীমিত সুযোগ সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে শিক্ষা খাতের কর্মচারীরাও আর্থিকভাবে কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারেন।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কিছুটা পুনরুদ্ধার হবে। কারণ গত এক দশকে মূল্যস্ফীতি যেভাবে বেড়েছে সেই তুলনায় বেতন বৃদ্ধি হয়নি। ফলে বাস্তবে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। নতুন স্কেল সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করছেন যেন বাস্তবায়নের সময় বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়। সরকারকে তাই খুব হিসাব করে ধাপে ধাপে এগোতে হবে।
এদিকে সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ এবং বিভিন্ন সংগঠন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে দীর্ঘদিন পর সরকার নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বাস্তব সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে 11 থেকে 20 তম গ্রেডের বৈষম্য কমানোর উদ্যোগকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তারা চাইছেন দ্রুত গেজেট প্রকাশ এবং বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হোক। কারণ শুধু ঘোষণা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়।
সবশেষে বলা যায় নবম পে স্কেল এখন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য শুধু একটি বেতন কাঠামো নয়, বরং এটি তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সম্মান এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত একটি বড় প্রত্যাশা। দীর্ঘ 11 বছর অপেক্ষার পর এখন সবাই চায় বাস্তব পরিবর্তন দেখতে। ধাপে ধাপে হোক কিংবা আংশিকভাবে হোক অন্তত নতুন পে স্কেলের যাত্রা শুরু হোক। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

0 Comments