আসসালামু আলাইকুম। দীর্ঘদিন পর আবারও সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় এক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে নবম পে স্কেল।
গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে 10 সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার। এই কমিটির মূল কাজ হচ্ছে তিনটি আলাদা প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ করে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা। আর সবচেয়ে বড় খবর হচ্ছে এই নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন 20 হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন 1 লাখ 60 হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
দীর্ঘ 11 বছর ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন পে স্কেলের অপেক্ষায় আছেন। এই সময়ের মধ্যে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত খরচ সবকিছুই বেড়েছে কয়েক ধাপে। কিন্তু অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। এমন বাস্তবতার মধ্যেই নতুন পে স্কেল নিয়ে আলোচনা আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা এবার যেন শুধু আলোচনা না হয়ে বাস্তবায়নের পথও খুলে যায়।
সরকারি সূত্র বলছে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য এবার ধাপে ধাপে এগোনোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কারণ একসাথে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করলে সরকারের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়বে। তাই তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি অংশ বৃদ্ধি করা হবে। এরপর পরবর্তী ধাপে পূর্ণ মূল বেতন এবং সর্বশেষ ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সমন্বয় করা হতে পারে। এই পরিকল্পনা নিয়েই এখন চূড়ান্ত আলোচনা চলছে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী বর্তমান সর্বনিম্ন মূল বেতন 8 হাজার 250 টাকা থেকে বাড়িয়ে 20 হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি হতে পারে। অন্যদিকে বর্তমান সর্বোচ্চ বেতন 78 হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে 1 লাখ 60 হাজার টাকা করার প্রস্তাব এসেছে। এর ফলে বিভিন্ন গ্রেডে 100 থেকে 140 শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, নতুন পে স্কেলে বেতন বৈষম্য কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমানে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত প্রায় 1:9 দশমিক 4। নতুন কাঠামোতে সেটিকে কমিয়ে 1:8 করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ উপরের গ্রেডের তুলনায় নিচের গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা এই বৈষম্য কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এবার সেই দাবির প্রতিফলন দেখা যেতে পারে নতুন বেতন কাঠামোতে।
তবে বড় পরিবর্তনের মধ্যেও বর্তমানের 20টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রেড সংখ্যা বাড়ানো বা কমানোর পথে যাচ্ছে না সরকার। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য আলাদা ধাপ বা বিশেষ স্কেল নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এই বিশেষ ধাপগুলো নিয়ে পরবর্তীতে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। ফলে উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা সুবিধা যোগ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সরকারি হিসাবে বর্তমানে প্রায় 14 লাখ সরকারি কর্মচারী এবং 9 লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। তাদের বেতন ও পেনশন বাবদ সরকারের ব্যয় এখন প্রায় 1 লাখ 31 হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে গেলে অতিরিক্ত আরও প্রায় 1 লাখ 6 হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ সরকারের জন্য এটি একটি বিশাল আর্থিক চ্যালেঞ্জ। তাই একসাথে পুরো বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এদিকে শুধু বেসামরিক কর্মচারী নয়, জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও আলাদা বেতন কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তিনটি প্রতিবেদন একসাথে বিশ্লেষণ করেই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এজন্যই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা এখন বাস্তবায়নের সময়, আর্থিক চাপ এবং সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে কাজ করছেন। খুব দ্রুতই তাদের সুপারিশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জমা পড়তে পারে।
অনেকেই জানতে চাইছেন এই পে স্কেল কবে থেকে কার্যকর হতে পারে। এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও ধারণা করা হচ্ছে আগামী অর্থবছর অর্থাৎ 2026-27 অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে বড় ঘোষণা আসতে পারে। বাজেটে প্রাথমিকভাবে 30 থেকে 35 হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার আলোচনা চলছে। যদি সেটি চূড়ান্ত হয় তাহলে 1 জুলাই থেকেই আংশিক বাস্তবায়নের পথ খুলে যেতে পারে। যদিও পুরো সুবিধা পেতে আরও সময় লাগতে পারে।
পেনশনভোগীদের জন্যও নতুন পে স্কেলে বড় সুখবর আসতে পারে। কারণ মূল বেতন বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব পেনশনেও পড়বে। অর্থাৎ যারা বর্তমানে কম পেনশন পাচ্ছেন তারাও উল্লেখযোগ্য হারে সুবিধা পেতে পারেন। অনেক পেনশনার দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে কষ্টে আছেন। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে তাদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যেও নতুন পে স্কেল নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অতীতের মতো এবারও তারা জাতীয় বেতন কাঠামোর আওতায় সুবিধা পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় তাদের সুবিধা বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবুও নতুন স্কেল চালু হলে তার প্রভাব শিক্ষা খাতেও পড়বে। শিক্ষকরা মনে করছেন এতে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা কিছুটা হলেও বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীদের স্বস্তি দেবে, অন্যদিকে সরকারের জন্য আর্থিক চাপও তৈরি করবে। কারণ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে অন্য পক্ষ বলছে দীর্ঘদিন বেতন না বাড়ায় কর্মচারীদের প্রকৃত আয় অনেক কমে গেছে। তাই এই সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। সরকারকে তাই দুই দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সবশেষে বলা যায় নবম পে স্কেল এখন শুধু একটি প্রশাসনিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবী, পেনশনভোগী এবং তাদের পরিবারের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। মানুষ এখন চায় বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্ত আসুক। ধাপে ধাপে হোক বা একাধিক পর্যায়ে হোক অন্তত নতুন পে স্কেলের যাত্রা শুরু হোক। কারণ দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীরা এখন বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চান। আগামী বাজেট এবং সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই এখন সবার নজর।

0 Comments