বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্ভাব্য নবম পে স্কেল।
বিভিন্ন সূত্র থেকে যেসব তথ্য সামনে আসছে তাতে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ১১ জুন ঘোষিত হতে যাওয়া জাতীয় বাজেটে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য বড় ধরনের অর্থ বরাদ্দ রাখা হতে পারে। অনেকেই বলছেন প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো বরাদ্দ থাকতে পারে শুধুমাত্র বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতির জন্য। যদিও এখনো সরকারিভাবে চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি, তারপরেও সচিবালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় ঘিরে আলোচনা কিন্তু থেমে নেই। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি কৌতূহল পে ফিক্সেশন এবং ইনক্রিমেন্ট নিয়ে। কারণ নতুন স্কেল চালু হলে পুরাতন ইনক্রিমেন্ট কীভাবে সমন্বয় হবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
অনেক সরকারি কর্মচারী মনে করছেন নতুন পে স্কেল চালু হলে হয়তো আগের ইনক্রিমেন্ট বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সাধারণত পূর্বের ইনক্রিমেন্টকে হিসাবের মধ্যেই ধরা হয়। অর্থাৎ আপনি বর্তমানে যে বেতন পাচ্ছেন সেটার সঙ্গে আপনার সার্ভিসের অভিজ্ঞতা ও ইনক্রিমেন্ট যুক্ত রয়েছে। তাই নতুন স্কেলে গিয়ে কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন সেজন্য একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পে ফিক্সেশন করা হয়ে থাকে। আগের কয়েকটি পে স্কেলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল। এবারও সেই ধরণের একটি কাঠামো অনুসরণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই ইনক্রিমেন্ট হারিয়ে যাবে এই ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
এখন আসি সহজ উদাহরণে যাতে সবাই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন। ধরুন একজন কর্মচারী বর্তমানে ১৪তম গ্রেডে কর্মরত আছেন। তার গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু চাকরির কয়েক বছর পার হওয়ায় এবং ইনক্রিমেন্ট যোগ হওয়ায় বর্তমানে তার মূল বেতন দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৫০ টাকা। অর্থাৎ তিনি এখন স্টার্টিং বেসিকের চেয়ে বেশি পাচ্ছেন। এই অতিরিক্ত অংশটাই মূলত ইনক্রিমেন্টের কারণে বেড়েছে। এখন যদি নতুন পে স্কেলে একই গ্রেডের শুরু ধরা হয় ২০ হাজার ৪০০ টাকা, তাহলে পুরনো ইনক্রিমেন্টকে কীভাবে যোগ করা হবে সেটাই এখন আমরা বুঝবো।
প্রথম ধাপে বের করতে হবে বর্তমানে আপনি স্টার্টিং বেসিকের চেয়ে কত বেশি বেতন পাচ্ছেন। এখানে বর্তমান বেতন ১৩ হাজার ৫০ টাকা আর পুরনো স্টার্টিং বেসিক ১০ হাজার ২০০ টাকা। এই দুইটির পার্থক্য বের করলে দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৫০ টাকা। এই ২ হাজার ৮৫০ টাকাই হলো আপনার চাকরির অভিজ্ঞতা এবং ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্জিত অংশ। অর্থাৎ এটি আপনার ব্যক্তিগত বেতন বৃদ্ধি যা সময়ের সঙ্গে তৈরি হয়েছে। এখন সরকার যদি নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করে তাহলে এই অংশটাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হবে না। বরং নতুন স্কেলের সঙ্গে সমন্বয় করেই বেতন নির্ধারণ করা হতে পারে।
এখন দ্বিতীয় ধাপে আসি। নতুন পে স্কেলে যদি ১৪তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২০ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, তাহলে এর সঙ্গে আগের পার্থক্যের টাকা যোগ করা হবে। অর্থাৎ ২০ হাজার ৪০০ টাকার সঙ্গে ২ হাজার ৮৫০ টাকা যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ২৩ হাজার ২৫০ টাকা। এটাই হতে পারে নতুন স্কেলে তার সম্ভাব্য বেতন। অর্থাৎ পুরনো ইনক্রিমেন্ট হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং নতুন বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিকে অনেকেই পে ফিক্সেশন বা বেতন সমন্বয় পদ্ধতি বলে থাকেন। এতে চাকরিতে পুরনোদের অভিজ্ঞতা ও সময়ের মূল্যায়ন বজায় থাকে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সরকার চাইলে এই বাস্তবায়ন এক ধাপে নাও করতে পারে। কারণ একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা সরকারের জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তাই দুই ধাপে বা তিন ধাপে বাস্তবায়নের আলোচনা এখন জোরেশোরে চলছে। প্রথম ধাপে হয়তো একটি নির্দিষ্ট শতাংশ বৃদ্ধি দেওয়া হবে এবং পরবর্তী ধাপে বাকি সুবিধাগুলো যোগ হতে পারে। অতীতেও বিভিন্ন সময় এমন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের উদাহরণ দেখা গেছে। তাই বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তব সুবিধা কবে থেকে কার্যকর হবে সেটি নিয়েও এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।
অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ আশা করছেন এবার শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো হতে পারে। বিশেষ করে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং পেনশন সুবিধার বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা চলছে। কারণ বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে শুধু মূল বেতন বৃদ্ধি করলেই পুরো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির কারণে অনেকেই জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাই নতুন পে স্কেলে যদি সামগ্রিকভাবে সুবিধা বাড়ানো হয় তাহলে সেটি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অনেক বড় স্বস্তি হয়ে আসবে।
সবশেষে বলা যায়, এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও সরকারি পর্যায়ে নবম পে স্কেল নিয়ে জোরালো আলোচনা চলছে। আগামী ১১ জুনের বাজেটকে কেন্দ্র করে এখন সবার দৃষ্টি অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংসদের দিকে। যদি সত্যিই ৩৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয় তাহলে সেটি হবে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় একটি ইতিবাচক সংকেত। আর পে ফিক্সেশনের এই পদ্ধতি কার্যকর হলে আগের ইনক্রিমেন্টও সুরক্ষিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন শুধু অপেক্ষা চূড়ান্ত ঘোষণার, কারণ বাজেট ঘোষণার পরই পরিষ্কার হয়ে যাবে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের বাস্তব চিত্র।

0 Comments