আজকের ভিডিওতে আমরা আলোচনা করবো নবম জাতীয় পে স্কেলের চূড়ান্ত রিপোর্টে কোন কোন ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে
এবং বাস্তবায়ন হলে সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক সুবিধা কতটা বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রধান দাবি ছিল নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন এবং সেই সঙ্গে বিভিন্ন ভাতার যৌক্তিক বৃদ্ধি। এবার জাতীয় বেতন কমিশনের জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উঠে এসেছে। বিশেষ করে শিক্ষা ভাতা, টিফিন ভাতা, বৈশাখী ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রস্তাব এখন ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে। অনেকেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আংশিক তথ্য জানলেও পুরো বিষয়টি এখনো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেননি। তাই আজকের ভিডিওতে আমরা সহজ ভাষায় প্রতিটি ভাতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো। শেষ পর্যন্ত দেখলে আপনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন কোন ভাতা কতটা বাড়তে পারে এবং এতে সরকারি চাকরিজীবীরা কতটা উপকৃত হবেন।
প্রথমেই আসি সন্তানদের শিক্ষা সহায়ক ভাতার বিষয়ে। বর্তমানে অধিকাংশ সরকারি চাকরিজীবী প্রতি সন্তান বাবদ ৫০০ টাকা করে শিক্ষা ভাতা পেয়ে থাকেন এবং সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য এই সুবিধা কার্যকর রয়েছে। অর্থাৎ দুই সন্তানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এই ভাতা বাড়িয়ে প্রতি সন্তান বাবদ ২০০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অনেক নিউজ পোর্টালে ভুলভাবে বলা হচ্ছে যে ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কর্মচারী এখনো ৫০০ টাকা হারে ভাতা পান। তাই এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা ব্যয়ের চাপ অনেকটাই কমে আসবে। বর্তমানে স্কুল-কলেজের ভর্তি ফি, কোচিং এবং বইয়ের খরচ যেভাবে বেড়েছে তাতে এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলেই মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এটি বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে।
এবার আসি টিফিন ভাতার বিষয়ে। বর্তমানে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মাত্র ২০০ টাকা টিফিন ভাতা পেয়ে থাকেন, যা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে একেবারেই অপ্রতুল। নতুন সুপারিশ অনুযায়ী এই টিফিন ভাতা বাড়িয়ে ১০০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে অফিসে একটি সাধারণ নাস্তার খরচও অনেক বেড়ে গেছে, ফলে এই ভাতা বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তাই কমিশনের এই সুপারিশকে অধিকাংশ সরকারি কর্মচারী ইতিবাচকভাবে দেখছেন। একই সঙ্গে বৈশাখী ভাতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা দেওয়া হলেও সেটিকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। যদি এটি কার্যকর হয় তাহলে ঈদ বা বাংলা নববর্ষের সময় সরকারি চাকরিজীবীরা বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা পাবেন।
এরপর আলোচনা করবো যাতায়াত ভাতা নিয়ে। আগে শুধুমাত্র ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা এই ভাতা পেতেন। কিন্তু নতুন সুপারিশ অনুযায়ী ১০ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের এই সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ আরও বেশি সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী যাতায়াত ভাতা পাবেন। বর্তমান সময়ে পরিবহন ব্যয় যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করাও অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যারা দূরবর্তী এলাকা থেকে অফিস করেন তাদের জন্য এই ভাতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ২০০০ টাকা বিশেষ ভাতা দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য এই সুবিধা কার্যকর হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিবন্ধী সন্তান থাকা পরিবারগুলো চিকিৎসা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেকটা সহায়তা পাবে।
এবার আসি পেনশনভোগীদের বিষয় নিয়ে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যাদের মাসিক পেনশন ২০ হাজার টাকার নিচে, তাদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে যারা পেনশন পান তাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। আর ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য প্রায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নানা সংকটে ছিলেন। বিশেষ করে ওষুধ, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় তাদের অনেকেই আর্থিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তাই এই সুপারিশ কার্যকর হলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান কিছুটা হলেও উন্নত হতে পারে। অনেকে এটিকে পেনশন ব্যবস্থায় একটি বড় সংস্কারের সূচনা হিসেবেও দেখছেন।
চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও নতুন ও ব্যতিক্রমধর্মী প্রস্তাব এসেছে। আগে সবার জন্য একই হারে চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হলেও এবার বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীরা মাসিক প্রায় ১০ হাজার টাকার সমপরিমাণ চিকিৎসা সুবিধা পেতে পারেন। ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের নিচে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ৪০ বছরের নিচে থাকা পেনশনভোগীদের জন্য ৪ হাজার টাকার চিকিৎসা সহায়তার কথাও বলা হয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যায়, তাই এই প্রস্তাবকে বাস্তবসম্মত বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। বিশেষ করে বৃদ্ধ পেনশনভোগীদের জন্য এটি বড় ধরনের সহায়ক সিদ্ধান্ত হতে পারে।
সবশেষে বাড়িভাড়া এবং পে স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময় নিয়ে কিছু কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। সেখানে স্পষ্টভাবে কোন শতাংশ উল্লেখ না থাকলেও ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বাড়িভাড়া তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। কারণ নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন কম হওয়ায় তাদের জন্য বাসাভাড়া বহন করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ১ থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হারে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে। এতে করে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে কিছুটা বৈষম্য কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় পুরো পে স্কেল একসাথে বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। আগামী কয়েক অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হতে পারে বলে আলোচনা চলছে। এখন দেখার বিষয় হলো সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এই সুপারিশগুলোর কতটুকু বাস্তবে কার্যকর হয় এবং সরকারি চাকরিজীবীরা কতটা সুবিধা পান।

0 Comments