আসসালামু আলাইকুম। আজকের ভিডিওটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
কারণ আজ আমরা খুব সহজ ভাষায় জানবো নতুন নবম পে স্কেল কার্যকর হলে আপনার বেতন কিভাবে নির্ধারণ হবে এবং আপনি নিজেই কিভাবে আপনার পে ফিক্সেশন হিসাব করতে পারবেন। অনেকেই মনে করেন পে ফিক্সেশন খুব জটিল একটি বিষয়। কিন্তু আজকের ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন এটি আসলে খুব সহজ একটি প্রক্রিয়া। বিশেষ করে যারা এখন থেকেই জানতে চান নতুন পে স্কেলে তাদের বেসিক কত হতে পারে, তাদের জন্য আজকের আলোচনা অনেক উপকারী হবে। তাই ভিডিওটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখুন।
প্রথমেই আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নিই। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে সাধারণত দুই ধরনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। একটি হচ্ছে পার্থক্যযোগ পদ্ধতি এবং অন্যটি হচ্ছে ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি। এই দুই পদ্ধতির মাধ্যমে পুরাতন স্কেলের বেতনকে নতুন স্কেলে রূপান্তর করা হয়। তবে বাস্তবে কোন পদ্ধতি কার্যকর হবে সেটি সরকার গেজেট প্রকাশের সময় নির্ধারণ করে দেয়। আগের পে স্কেলগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি বাংলাদেশে বেশিরভাগ সময় পার্থক্যযোগ পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়েছে। তবুও দুইটি পদ্ধতি বুঝে রাখা দরকার, কারণ তখন আপনি নিজেই হিসাব মিলিয়ে দেখতে পারবেন।
এখন আমরা একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে পুরো বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করবো। ধরা যাক একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারী অষ্টম পে স্কেলে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন ৮২৫০ টাকা বেসিক নিয়ে। কয়েক বছর ইনক্রিমেন্ট যোগ হওয়ার পরে বর্তমানে তার বেসিক দাঁড়িয়েছে ১০,৫৬০ টাকা। এখন ধরা হচ্ছে নবম পে স্কেলে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাহলে নতুন স্কেলে ওই কর্মচারীর বেতন কত হবে সেটিই আমরা হিসাব করবো। এখান থেকেই মূলত পে ফিক্সেশনের কাজ শুরু হয়। আর এই হিসাবটাই সবচেয়ে বেশি জানতে চান সরকারি কর্মচারীরা।
প্রথমে আমরা পার্থক্যযোগ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করি। এই পদ্ধতিতে পুরাতন স্কেলের বর্তমান বেতন থেকে প্রারম্ভিক বেতন বিয়োগ করতে হয়। অর্থাৎ আমাদের উদাহরণে ১০,৫৬০ টাকা থেকে ৮২৫০ টাকা বিয়োগ করলে পার্থক্য দাঁড়ায় ২৩১০ টাকা। এই ২৩১০ টাকাই হচ্ছে ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে বাড়তি অংশ। এরপর নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই পার্থক্য যোগ করতে হবে। অর্থাৎ ২০,০০০ টাকার সঙ্গে ২৩১০ টাকা যোগ করলে দাঁড়ায় ২২,৩১০ টাকা। এখন যদি নতুন স্কেলের ধাপ অনুযায়ী ২২,৩১০ টাকার কোন ধাপ না থাকে, তাহলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপকে নতুন বেসিক হিসেবে ধরা হবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝে রাখতে হবে। নতুন পে স্কেলে প্রত্যেক গ্রেডে বিভিন্ন ধাপ বা স্টেজ থাকে। আপনার গণনাকৃত বেতন যদি কোনো নির্দিষ্ট ধাপের সঙ্গে পুরোপুরি না মিলে, তাহলে সেটিকে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে উন্নীত করা হয়। অর্থাৎ আপনার হিসাব যদি ২২,৩১০ টাকা আসে কিন্তু স্কেলে যদি ২২,৩০০ বা ২২,৫০০ টাকার ধাপ থাকে, তাহলে আপনি সরাসরি ২২,৫০০ টাকার ধাপে চলে যাবেন। এই নিয়মটি আগের পে স্কেলগুলোতেও অনুসরণ করা হয়েছে। তাই অনেক সময় দেখা যায় হিসাবের তুলনায় বাস্তব বেতন কিছুটা বেশি হয়ে যায়। এটিই সরকারি পে ফিক্সেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা।
এখন আমরা ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি নিয়ে কথা বলবো। এই পদ্ধতিতে প্রথমে একটি ফ্যাক্টর বের করতে হয়। বর্তমান বেতনকে পুরাতন প্রারম্ভিক বেতন দিয়ে ভাগ করলে এই ফ্যাক্টর পাওয়া যায়। আমাদের উদাহরণে ১০,৫৬০ ভাগ ৮২৫০ করলে ফ্যাক্টর দাঁড়ায় প্রায় ১.২৮। এখন এই ফ্যাক্টরকে নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে গুণ করতে হবে। অর্থাৎ ২০,০০০ গুণ ১.২৮ করলে নতুন বেতন দাঁড়ায় ২৫,৬০০ টাকা। এখানেও যদি নির্দিষ্ট ধাপ না থাকে তাহলে পরবর্তী ধাপকে চূড়ান্ত বেসিক হিসেবে ধরা হবে।
আপনারা লক্ষ্য করলে দেখবেন ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতিতে বেতন তুলনামূলক অনেক বেশি আসে। যেখানে পার্থক্যযোগ পদ্ধতিতে একজন কর্মচারীর বেতন আসছিল প্রায় ২৩ হাজার টাকা, সেখানে ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতিতে সেটি চলে যাচ্ছে ২৬ হাজার টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ দুই পদ্ধতির মধ্যে কয়েক হাজার টাকার পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। আর যাদের চাকরির মেয়াদ বেশি এবং ইনক্রিমেন্ট বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই চান ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি বাস্তবায়ন হোক। তবে বাস্তবতা হলো সরকার সাধারণত পার্থক্যযোগ পদ্ধতিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
এখন আসি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়। অনেক জায়গায় আলোচনা হচ্ছে নবম পে স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হতে পারে। ধরা যাক প্রথম বছরে মোট বেতন বৃদ্ধির ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হলো। তাহলে আমাদের উদাহরণে পার্থক্যযোগ পদ্ধতিতে নতুন বেতন ছিল ২৩,০০০ টাকা। বর্তমানে তিনি পাচ্ছেন ১০,৫৬০ টাকা। অর্থাৎ মোট বৃদ্ধি হচ্ছে ১২,৪৪০ টাকা। যদি এর অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হয়, তাহলে প্রথম ধাপে বেতন বাড়বে ৬,২২০ টাকা। তখন তার নতুন বেসিক দাঁড়াবে প্রায় ১৬,৭৮০ টাকা।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে এই বেতন কি বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে একজন সরকারি কর্মচারীর জন্য যথেষ্ট হবে? কারণ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় এবং সন্তানের পড়াশোনার খরচ সবকিছুই আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। একজন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীর পক্ষে সীমিত বেতনে পরিবার চালানো এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই অনেকেই মনে করছেন যদি নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করতেই হয়, তাহলে অন্তত বড় অংশ একসাথে কার্যকর করা উচিত। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে বাস্তব সুবিধা পেতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। এই বিষয়টি নিয়েও এখন বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, শুধু বেসিক বাড়লেই মোট সুবিধা শেষ হয়ে যায় না। বেসিকের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বৃদ্ধি পায়। কারণ বেশিরভাগ ভাতা মূল বেতনের উপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন পে স্কেলে একজন কর্মচারীর মোট প্রাপ্তি আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা এই সুবিধা থেকে বেশি উপকৃত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই পে ফিক্সেশন শুধু বেসিক হিসাব নয়, এটি পুরো আর্থিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সবশেষে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা যায়, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সঠিক পদ্ধতিতে পে ফিক্সেশন বুঝে নেওয়া খুব জরুরি। কারণ আপনি নিজেই যদি হিসাব করতে পারেন তাহলে কোনো বিভ্রান্তিতে পড়তে হবে না। আজকের ভিডিওতে আমরা খুব সহজভাবে পার্থক্যযোগ পদ্ধতি এবং ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এখন আপনাদের কাছে প্রশ্ন, আপনার মতে কোন পদ্ধতিতে পে ফিক্সেশন হলে সরকারি চাকরিজীবীরা বেশি উপকৃত হবেন? পার্থক্যযোগ পদ্ধতি নাকি ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি? অবশ্যই কমেন্টে আপনার মতামত জানাবেন।

0 Comments