আসসালামু আলাইকুম। আশা করি সবাই ভালো আছেন। আজকের এই ভিডিওতে আমরা কথা বলবো আগামী ৭ জুনের জাতীয় বাজেট, নবম পে স্কেলের সম্ভাব্য ঘোষণা

ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের আলোচনা, পে ফিক্সেশনের পুরনো নিয়ম এবং পেনশনভোগীদের জন্য আসতে যাওয়া সম্ভাব্য সুবিধা নিয়ে। কয়েকদিন ধরেই সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের অপেক্ষা কাজ করছে। সবাই জানতে চাচ্ছেন এবার কি সত্যিই নতুন পে স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসছে? বিশেষ করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বরাদ্দের খবর সামনে আসার পর আলোচনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সচিবালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি অফিস পর্যন্ত এখন একটাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—নবম পে স্কেল কবে, কিভাবে এবং কত ধাপে বাস্তবায়ন হবে।

সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি এখন ঘুরছে সেটি হলো নবম পে স্কেল কি দুই ধাপে বাস্তবায়ন হবে নাকি তিন ধাপে? কারণ বিভিন্ন সূত্রে দুই ধরনের তথ্যই শোনা যাচ্ছে। কেউ বলছেন প্রথম ধাপে বেসিকের পুরো অংশ দিয়ে পরের ধাপে ভাতা সমন্বয় করা হবে। আবার কেউ বলছেন তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে এটি কার্যকর হবে। যদি তিন ধাপে বাস্তবায়ন হয় তাহলে প্রথম বছরে বেসিক বৃদ্ধির মাত্র ৫০ শতাংশ কার্যকর হতে পারে বলে আলোচনা চলছে। আর এই বিষয়টিই এখন সরকারি কর্মচারীদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে অর্ধেক সুবিধা দিয়ে সংসার চালানো কতটা সম্ভব হবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেভাবে বেড়েছে তাতে পুরনো বেতন কাঠামোতে টিকে থাকা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে। চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ—সবকিছুর দাম গত কয়েক বছরে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি চাপে আছেন। অনেকেই মাসের মাঝামাঝি সময়েই ধার করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই নতুন পে স্কেলের প্রতি সবার প্রত্যাশা অনেক বেশি। কর্মচারীরা মনে করছেন অন্তত এমন একটি কাঠামো দরকার যেখানে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবন চালানো সম্ভব হবে। আর সেই কারণেই বাজেট ঘোষণার দিকে এখন সবার চোখ।

কয়েকদিন আগে আমরা পে ফিক্সেশন নিয়ে যে আলোচনা করেছিলাম সেখানে অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন—আগের পে স্কেলগুলোতেও কি পার্থক্যযোগ পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট দেখতে হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে পুরনো স্কেলের বর্তমান বেতন এবং প্রারম্ভিক বেতনের পার্থক্য বের করে সেই পার্থক্য নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে যোগ করতে হবে। অর্থাৎ পার্থক্যযোগ পদ্ধতিই আগের পে স্কেলে ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে এবারও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে প্রকাশিত গেজেটেই জানা যাবে।

ধরুন একজন ১৭তম গ্রেডের কর্মচারী ২০১৫ সালের স্কেলে ৯ হাজার টাকা বেসিকে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কয়েক বছর ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়ে এখন তার বেসিক দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯২০ টাকা। তাহলে প্রথমে তার বর্তমান বেতন থেকে প্রারম্ভিক বেতন বাদ দিয়ে ইনক্রিমেন্টের পার্থক্য বের করা হবে। এরপর সেই পার্থক্য নতুন পে স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে যোগ করা হবে। যদি নতুন স্কেলে ১৭তম গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপ ধরা হয় ২১ হাজার ৪০০ টাকা, তাহলে তার সঙ্গে ইনক্রিমেন্টের পার্থক্য যোগ করলে নতুন বেসিক দাঁড়াবে আরও বেশি। আর যদি সেই অংক স্কেলের কোনো নির্দিষ্ট ধাপে না থাকে তাহলে নিকটতম উচ্চতর ধাপকে চূড়ান্ত বেসিক হিসেবে ধরা হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি। অনেকেই এই পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তিতে আছেন। এই পদ্ধতিতে প্রথমে বর্তমান বেতনকে পুরনো প্রারম্ভিক বেতন দিয়ে ভাগ করে একটি ফ্যাক্টর বের করা হয়। এরপর সেই ফ্যাক্টর নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে গুণ করা হয়। এতে নতুন বেসিক নির্ধারণ করা যায়। তবে সবসময় এই পদ্ধতি কার্যকর হয় না। কারণ সরকার যখন গেজেট প্রকাশ করবে তখন স্পষ্টভাবে বলে দেবে কোন পদ্ধতিতে পে ফিক্সেশন হবে। তাই এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব না হলেও আগের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পার্থক্যযোগ পদ্ধতির সম্ভাবনাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

এখন আসা যাক সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—বেতন কত বাড়তে পারে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে এবার বেতন দ্বিগুণ হচ্ছে না। কারণ সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে। ফলে যারা ভাবছেন এক লাফে বেতন দ্বিগুণ হয়ে যাবে তারা হয়তো কিছুটা হতাশ হতে পারেন। তবে এটাও সত্য যে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের দিকে এবার বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের বর্তমান বেতন খুব কম তারা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন। সরকারও চাইছে নিচের স্তরের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা হলেও বাড়াতে।

পেনশনভোগীদের জন্যও এবার বড় ধরনের সুখবর আসতে পারে বলে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে কম পেনশনধারীরা তুলনামূলক বেশি হারে সুবিধা পেতে পারেন। যারা বর্তমানে ২০ হাজার টাকার নিচে পেনশন পাচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির আলোচনা রয়েছে। আবার ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে যারা আছেন তারা ৬০ শতাংশের আশেপাশে সুবিধা পেতে পারেন। যদিও এগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়, তারপরও পেনশনভোগীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই তারা বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশেষ ভাতা এবং ইনক্রিমেন্ট। বর্তমানে যে বিশেষ প্রণোদনা বা বিশেষ ভাতা দেওয়া হচ্ছে সেটি নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু থাকবে। অর্থাৎ প্রতি বছর ১ জুলাই যে নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট যোগ হয় সেটি বন্ধ হচ্ছে না। বরং সেই ইনক্রিমেন্ট ধরেই নতুন পে ফিক্সেশন করা হতে পারে। ফলে যাদের কয়েকটি ইনক্রিমেন্ট জমা হয়েছে তারা নতুন স্কেলে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে যেতে পারেন। এ কারণেই এখন সবাই নিজেদের সম্ভাব্য বেতন হিসাব করতে শুরু করেছেন।

বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়েও বড় আলোচনা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে। যদি এটি বাস্তবায়ন হয় তাহলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একইসঙ্গে এনবিআর সংস্কার, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ এত বড় পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়াতে হবে। আর সেই কারণেই বাজেটে অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।

এদিকে বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী নিজেদের জন্য আলাদা পে কমিশনের দাবিও তুলছেন। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্যকর্মী এমনকি শিক্ষকরাও বলছেন তাদের কাজের ধরন অনুযায়ী বিশেষ বেতন কাঠামো দরকার। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয়। আবার ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য অতিরিক্ত সুবিধারও প্রয়োজন রয়েছে। সরকার এই বিষয়গুলো কতটা বিবেচনায় নেবে সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠতে শুরু করেছে যে সাধারণ কাঠামোর পাশাপাশি বিশেষায়িত খাতগুলোর জন্য আলাদা সুবিধা থাকা উচিত।

সবশেষে বলা যায়, নবম পে স্কেল নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কিছু ঘোষণা না এলেও সরকারের ভেতরে প্রস্তুতি অনেক দূর এগিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৭ জুনের বাজেট অধিবেশনের দিকে এখন লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং পেনশনভোগী তাকিয়ে আছেন। কেউ আশাবাদী, কেউ আবার আগের অভিজ্ঞতার কারণে কিছুটা সতর্ক। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বেতন কাঠামো এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয় সরকার শেষ পর্যন্ত দুই ধাপে নাকি তিন ধাপে এই পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে হাঁটে। আপনার মতে কোনটি ভালো হবে—দুই ধাপে নাকি তিন ধাপে? কমেন্টে অবশ্যই জানাবেন।

Post a Comment

0 Comments