আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ইতোমধ্যে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই বিষয় নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় ছিলেন। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে বেতন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বলে আলোচনা চলছে। আজকের ভিডিওতে আমরা জানবো কারা এই নতুন পে স্কেলের আওতায় আসছেন, কারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে চলেছেন এবং পেনশন সুবিধায় কি ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নবম পে স্কেল নির্ধারণে গঠিত সচিব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। বৈঠকে মূলত দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে অনেক কর্মচারী পরিবার নিয়ে চরম সংকটে দিন পার করছেন। তাই এবারের পে স্কেলে নিচের স্তরের চাকরিজীবীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার দিকেই সরকার জোর দিচ্ছে।

সচিবালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, এবারের পে স্কেলে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, আধা স্বায়ত্তশাসিত এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিষয়েও আলাদা নির্দেশনা আসতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সরকারি বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কারণ একই ধরনের কাজ করেও অনেক ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলক কম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। সরকার এবার সেই বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ফলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হলে এইসব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্যও নতুন গাইডলাইন তৈরি হতে পারে। এতে করে তাদের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় চলে আসবে।

নতুন পে স্কেলের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হচ্ছে নিচের স্তরের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, সরকার এবার বেতন বৈষম্য কমানোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের চাকরিজীবীরা বেশি হারে বেতন বৃদ্ধি পেতে পারেন। কারণ একজন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীর মাসিক আয় দিয়ে বর্তমান বাজারে পরিবার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ বাজার থেকে চাল, ডাল, তেল বা অন্যান্য পণ্য কিনতে হলে সবাইকেই একই দাম দিতে হচ্ছে। তাই সরকার মনে করছে, যারা কম বেতন পান তাদের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই কারণেই এবারের পে স্কেলে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বাড়তি সুবিধা রাখার আলোচনা চলছে।

এদিকে শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নতুন পে স্কেলের আওতাভুক্ত থাকবেন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাই সরকার এবার সব সেক্টরের কর্মচারীদের জন্য একটি সমন্বিত বেতন কাঠামো তৈরি করতে চাচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে সেটিও কিছুটা কমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি শিক্ষা খাতের কর্মচারীরাও এই নতুন সিদ্ধান্তে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন।

পেনশন সুবিধা নিয়েও এবার বড় ধরনের আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে যারা বর্তমানে খুব কম পেনশন পাচ্ছেন তাদের জন্য বিশেষ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সচিব কমিটির সভায় এমন একটি প্রস্তাব উঠেছে যেখানে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পেনশন শতভাগ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব পেনশনার বর্তমানে ২০ হাজার টাকার নিচে পেনশন পাচ্ছেন তারা নতুন সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন। কারণ বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই অল্প টাকায় সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সরকার চাইছে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও যেন সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।

সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাস্তবসম্মতভাবে নবম পে স্কেল কার্যকর করা। কারণ একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়ন করা জরুরি, অন্যদিকে সরকারের ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তাই এবার এমন একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে যেখানে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা বেশি সুবিধা পাবেন এবং একই সঙ্গে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপও না পড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ অনেকটাই কমে আসবে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে বেতন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন তারা সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পাবেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এবারের পে স্কেলে শুধু বেতন বাড়ানো নয় বরং সুযোগ-সুবিধার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া, যাতায়াত সুবিধা এবং অবসরকালীন সুবিধার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। সরকার চাইছে চাকরিজীবীরা যেন শুধু মাস শেষে বেতন নয়, সামগ্রিকভাবে একটি ভালো জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে পারেন। কারণ বর্তমানে অনেক কর্মচারী আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপে পড়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। তাই নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে তাদের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে আলোচনা চলছে।

Post a Comment

0 Comments