আসসালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বড় আপডেট সামনে এসেছে।
আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকরের প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন বেতন কাঠামো একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের দিকেই এগোচ্ছে সরকার। কারণ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বাজেটের চাপ এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এই পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে সুখবর হচ্ছে—সরকার নীতিগতভাবে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন।
দর্শক, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সচিবালয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাজেট সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোতে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন। এসব বৈঠকে মূলত আগামী অর্থবছরের ব্যয়, রাজস্ব আয় এবং সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সূত্র বলছে, সরকার চাইছে এমনভাবে নতুন পে স্কেল কার্যকর করতে যাতে একদিকে চাকরিজীবীরা স্বস্তি পান, অন্যদিকে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপও না পড়ে। তাই এবার বাস্তবতার আলোকে পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।
এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হচ্ছে—তিন ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম দুই অর্থবছরে মূল বেতনের বৃদ্ধি ধাপে ধাপে কার্যকর করা হতে পারে। আর তৃতীয় ধাপে যুক্ত হবে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক একজন কর্মকর্তার বর্তমান মূল বেতন ৫০ হাজার টাকা। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সেটি যদি এক লাখ টাকায় উন্নীত হয়, তাহলে প্রথম বছর তিনি পুরো এক লাখ টাকা পাবেন না। বরং বর্ধিত অংশের অর্ধেক যোগ হয়ে তার মূল বেতন দাঁড়াবে ৭৫ হাজার টাকা। এরপর দ্বিতীয় বছরে তিনি পুরো এক লাখ টাকা মূল বেতন হিসেবে পাবেন। আর তৃতীয় বছরে নতুন ভাতা কাঠামো কার্যকর হবে।
দর্শক, এই পরিকল্পনার পেছনে সরকারের মূল যুক্তি হচ্ছে আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা। কারণ একবারে পুরো বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করা হলে সরকারের ওপর বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে সরকার খুব সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর নতুন পে স্কেল আসছে, তাই সেটি এক ধাপেই বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হলে কর্মচারীরা প্রকৃত সুবিধা পেতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। তারপরও অনেকেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে বলছেন, ধাপে ধাপে হলেও নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়াটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।
নতুন বেতন কাঠামোতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের একটি হতে পারে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন বৃদ্ধি। বর্তমানে যেখানে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা, সেখানে সেটি বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। তবে গ্রেড সংখ্যা আগের মতোই ২০টি রাখা হতে পারে। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, মুখ্য সচিব এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য আলাদা বিশেষ ধাপ রাখার কথাও আলোচনায় রয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে আলাদা সুবিধা দেওয়ার একটি কাঠামো তৈরি করা হতে পারে।
দর্শক, মূল বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধাও। কারণ সরকারি চাকরিজীবীদের অধিকাংশ ভাতা মূল বেতনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্তমানে বৈশাখী ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হলেও সেটিকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ এসেছে। এছাড়া যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। আগে যেখানে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত এই সুবিধা ছিল, এখন সেটি ১০ম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের চাকরিজীবীদের আর্থিক সুবিধা তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর চেষ্টা করছে কমিশন।
এখন আসা যাক পেনশনভোগীদের প্রসঙ্গে। নতুন পে স্কেলে শুধু কর্মরত চাকরিজীবীরাই নয়, পেনশনভোগীরাও বড় ধরনের সুবিধা পেতে পারেন বলে আলোচনা চলছে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী যারা বর্তমানে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর যারা ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশন পান, তাদের জন্য ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। এছাড়া ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার এবার পেনশনভোগীদের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
এছাড়া বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রেও আলাদা নীতি নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। বিশেষ করে উচ্চ গ্রেডের চাকরিজীবীদের তুলনায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়া তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। এর কারণ হলো নিচের ধাপের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি আর্থিক চাপে থাকেন। ফলে সরকার চাচ্ছে সুবিধার বণ্টনে কিছুটা ভারসাম্য আনতে। একইসঙ্গে বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি, তারপরও এসব প্রস্তাব চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

0 Comments