আসসালামু আলাইকুম প্রিয় দর্শক। দেশের লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর বহুদিনের প্রতীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু এখন একটাই বিষয়, আর সেটি হচ্ছে নবম পে স্কেল।
চারদিকে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে নতুন বেতন কাঠামো, সম্ভাব্য বাজেট বরাদ্দ এবং পে ফিক্সেশন নিয়ে। কারণ বেতন বাড়বে শুনলেই মানুষের প্রথম প্রশ্ন থাকে আমার হাতে আসলে কত টাকা বাড়বে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকের এই বিশেষ আয়োজন। যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে তাহলে আগামী বাজেটেই নবম পে স্কেলের জন্য বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ হতে পারে বলে জোর আলোচনা চলছে। আর এই খবর সরকারি কর্মচারীদের মাঝে নতুন আশার আলো তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। কারণ বাজারে প্রতিদিন দ্রব্যমূল্য বাড়ছে কিন্তু সেই তুলনায় আয় বাড়ছিল না। একজন কর্মচারী মাসের শুরুতে বেতন পেলেও মাসের শেষদিকে গিয়ে তাকে ধার বা ঋণের উপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি চাপে ছিলেন। পরিবারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং বাসাভাড়ার চাপ তাদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। তাই নতুন পে স্কেলের খবর তাদের কাছে শুধু অর্থনৈতিক বিষয় না, এটি এখন বাঁচার স্বস্তির নাম।
এখন সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরছে সেটি হলো, নতুন পে স্কেল যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে সেটি একবারে কার্যকর হবে নাকি ধাপে ধাপে। বিভিন্ন সূত্র বলছে সরকার একসাথে পুরো চাপ নিতে চাইছে না। তাই দুই ধাপ বা তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে প্রথম ধাপে কিছু অংশ কার্যকর হবে এবং পরবর্তী সময়ে বাকিটা যোগ হবে। এতে সরকারের ওপর এককালীন চাপ কমবে আবার কর্মচারীরাও ধীরে ধীরে সুবিধা পেতে শুরু করবেন। এই পরিকল্পনাকেই এখন বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
অনেকেই ভাবছেন পে স্কেল মানেই শুধু বেতন বাড়ানো। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তার থেকেও বড়। কারণ নতুন পে স্কেল চালু হলে পুরো বেতন কাঠামোই বদলে যায়। গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন পরিবর্তন হয়, ইনক্রিমেন্টের হিসাব বদলে যায়, বিভিন্ন ভাতার পরিমাণও পরিবর্তিত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পে ফিক্সেশন। কারণ এই পে ফিক্সেশন ঠিক করে একজন কর্মচারী নতুন স্কেলে আসলে কত টাকা পাবেন। তাই আজকের আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে এই পে ফিক্সেশন পদ্ধতি।
অনেক দর্শক প্রশ্ন করেছেন পুরোনো ইনক্রিমেন্ট কি থাকবে? আগে যত বছর চাকরি করেছেন সেগুলোর হিসাব কি নতুন স্কেলে যোগ হবে? উত্তর হচ্ছে সাধারণত আগের চাকরির অভিজ্ঞতা এবং ইনক্রিমেন্ট বিবেচনা করেই নতুন বেতন নির্ধারণ করা হয়। তবে সেটি কীভাবে করা হবে সেটার জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আর বাংলাদেশে অতীতের পে স্কেলগুলোতেও একই ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। এবারও সেই ধারাবাহিকতা থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
যখনই নতুন পে স্কেল আসে তখন মূলত দুই ধরনের পদ্ধতির কথা আলোচনায় আসে। একটি হচ্ছে ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি এবং অন্যটি হচ্ছে পার্থক্য যোগ পদ্ধতি। এই দুটি পদ্ধতির মধ্যেই নির্ধারিত হয় একজন কর্মচারীর নতুন বেতন। তবে বাস্তবে কোন পদ্ধতি সরকার ব্যবহার করবে সেটাই হচ্ছে আসল বিষয়। কারণ দুই পদ্ধতিতে হিসাব করলে বেতনের অংকে বড় পার্থক্য দেখা যায়। আর সেই কারণেই কর্মচারীদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে।
চলুন প্রথমে ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি নিয়ে সহজভাবে কথা বলি। ধরুন একজন কর্মচারী বর্তমানে 14 তম গ্রেডে আছেন। তার গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল 10 হাজার 200 টাকা। কয়েক বছর ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার পর এখন তার মূল বেতন দাঁড়িয়েছে 13 হাজার 50 টাকা। এখন নতুন পে স্কেলে যদি একই গ্রেডের শুরু হয় 20 হাজার 400 টাকা, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে নতুন বেতন কত হবে। এখানেই কাজ করবে ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর।
এই পদ্ধতিতে প্রথমে বর্তমান বেতনকে পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতন দিয়ে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ 13 হাজার 50 কে 10 হাজার 200 দিয়ে ভাগ করলে একটি অনুপাত পাওয়া যায়। এই অনুপাতই হচ্ছে ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর। ধরুন সেটি দাঁড়াল 1 দশমিক 27। এরপর নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সাথে এই ফ্যাক্টর গুণ করা হয়। ফলে নতুন বেতন উঠে আসে অনেক বেশি অংকে।
এখন যদি আমরা 20 হাজার 400 টাকার সাথে 1 দশমিক 27 গুণ করি তাহলে বেতন দাঁড়াবে প্রায় 26 হাজার টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ কর্মচারী তার আগের সব ইনক্রিমেন্টের পূর্ণ সুবিধা ধরে রাখতে পারছেন। এই কারণেই অনেক কর্মচারী চান ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি ব্যবহার করা হোক। কারণ এতে তুলনামূলকভাবে বেতন বেশি আসে। আর নতুন স্কেলে প্রবেশের পরও পুরোনো চাকরির মূল্যায়ন বজায় থাকে।
কিন্তু বাস্তবে সবসময় এই পদ্ধতি ব্যবহার হয় না। কারণ সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই পদ্ধতিতে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। লাখ লাখ কর্মচারীর বেতন যদি একসাথে অনেক বেড়ে যায় তাহলে সরকারের ওপর বিশাল চাপ পড়ে। তাই সরকার সাধারণত এমন পদ্ধতি খোঁজে যেখানে ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আর সেখান থেকেই আসে পার্থক্য যোগ পদ্ধতি।
পার্থক্য যোগ পদ্ধতি শুনতে কঠিন লাগলেও আসলে খুব সহজ। এখানে প্রথমে দেখা হয় একজন কর্মচারীর বর্তমান বেতন এবং তার গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনের মধ্যে পার্থক্য কত। যেমন ধরুন একজন কর্মচারীর বর্তমান বেতন 13 হাজার 50 টাকা এবং তার গ্রেডের শুরু ছিল 10 হাজার 200 টাকা। তাহলে দুইটির পার্থক্য হলো 2 হাজার 850 টাকা। এই অতিরিক্ত অংশটাই মূল বিষয়।
এরপর নতুন স্কেলে সেই গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনের সাথে এই পার্থক্য যোগ করা হয়। অর্থাৎ নতুন স্কেলের শুরু যদি 20 হাজার 400 হয় তাহলে তার সাথে 2 হাজার 850 যোগ হবে। ফলে নতুন বেতন দাঁড়াবে 23 হাজার 250 টাকা। খেয়াল করলে দেখা যাবে এটি ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতির তুলনায় অনেক কম। আর এখানেই দুই পদ্ধতির বড় পার্থক্য।
বাংলাদেশের অতীতের পে স্কেলগুলোতে সাধারণত পার্থক্য যোগ পদ্ধতিই বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ এতে সরকারের ব্যয় কিছুটা কম থাকে। কর্মচারীরা যদিও বেশি সুবিধা চান, কিন্তু সরকারকে পুরো অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করতে হয়। তাই এবারও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি।
অনেকেই আবার জানতে চান যদি নির্ধারিত অংক সরাসরি চার্টে না থাকে তাহলে কী হবে। এই ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে বেতন কখনো নিচের ধাপে নামবে না। বরং উপরের কাছাকাছি ধাপে উন্নীত করা হবে। যেমন হিসাব অনুযায়ী যদি 23 হাজার 250 আসে কিন্তু চার্টে এই সংখ্যা না থাকে, তাহলে তার উপরের ধাপ অর্থাৎ 23 হাজার 500 বা কাছাকাছি যেটি আছে সেটি নির্ধারণ করা হবে। এতে কর্মচারী ক্ষতিগ্রস্ত হন না।
নতুন পে স্কেল নিয়ে আরেকটি বড় আলোচনা হচ্ছে ইনক্রিমেন্ট থাকবে কি না। সাধারণত নতুন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর আগের ইনক্রিমেন্টের মূল্য হারিয়ে যায় না। বরং সেই অভিজ্ঞতাকে নতুন কাঠামোর সাথে সমন্বয় করা হয়। কারণ একজন কর্মচারী বহু বছর চাকরি করার পর যে অবস্থানে পৌঁছেছেন সেটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তাই নতুন স্কেলেও সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকে।
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আগ্রহ 11 থেকে 20 তম গ্রেড নিয়ে। কারণ এই স্তরের কর্মচারীরাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপে রয়েছেন। বর্তমান বাজারে তাদের বেতন দিয়ে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সরকারও প্রথম ধাপে এই নিম্ন গ্রেডগুলোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পাবেন নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন শুধু মূল বেতন বাড়ালেই হবে না। সাথে সাথে বাড়াতে হবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসাভাতা এবং টিফিন ভাতাও। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় এসব ভাতা অত্যন্ত অপ্রতুল। একজন কর্মচারী শহরে বাসা ভাড়া দিতেই বেতনের বড় অংশ হারিয়ে ফেলেন। সেখানে যদি ভাতা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তাহলে বেতন বৃদ্ধির পুরো সুফল পাওয়া যায় না।
পেনশনভোগীরাও এখন নতুন পে স্কেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। কারণ নতুন স্কেল কার্যকর হলে পেনশনও বাড়বে। যারা দীর্ঘদিন সরকারি চাকরি করেছেন তারা চান শেষ বয়সে একটু আর্থিক নিরাপত্তা। বিশেষ করে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পেনশনভোগী কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তাই নতুন পে স্কেল তাদের জীবনেও নতুন স্বস্তি আনতে পারে।
সরকারের সামনে অবশ্য বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে গেলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী লাখ লাখ কর্মচারী এবং পেনশনভোগীর জন্য অতিরিক্ত হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়বে। তাই সরকার ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের দিকেই ঝুঁকছে। এতে অর্থনৈতিক ভারসাম্যও বজায় থাকবে আবার কর্মচারীরাও ধীরে ধীরে সুবিধা পাবেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কবে নাগাদ এই নতুন পে স্কেল কার্যকর হতে পারে। বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে বাজেটে প্রাথমিক বরাদ্দ রাখা হলে প্রথম ধাপের কাজ শুরু হতে পারে খুব দ্রুতই। এরপর প্রজ্ঞাপন জারি এবং কারিগরি নির্দেশনা প্রকাশ করা হবে। তখন আইবাস এবং সংশ্লিষ্ট অডিট অফিসগুলো বিস্তারিত নির্দেশনা দেবে কীভাবে বেতন নির্ধারণ হবে।
অনেক কর্মচারী এখন নিজেরাই হিসাব করতে শুরু করেছেন। কেউ ক্যালকুলেটর নিয়ে বসে যাচ্ছেন, কেউ আবার বন্ধুর সাথে আলোচনা করছেন। কারণ মানুষের মনে একটা স্বাভাবিক আগ্রহ কাজ করে নতুন স্কেলে তার বেতন কত হতে পারে। আর এই আগ্রহই এখন সরকারি চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, নতুন পে স্কেল নিয়ে আশাবাদ এখন আগের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি। সরকারি চাকরিজীবীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন এবার হয়তো সত্যিই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে পারে। আর যদি সেটি বাস্তবায়ন হয় তাহলে লাখ লাখ পরিবারের জীবনে নতুন স্বস্তি ফিরে আসবে।

0 Comments